ভাব-সম্প্রসারণ : বাংলা ২য় পত্র - নবম ও দশম শ্রেণি, এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা (১ম পর্ব)

 ভাব-সম্প্রসারণ : বাংলা ২য় পত্র - নবম ও দশম শ্রেণি, এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা (১ম পর্ব)

ভাব-সম্প্রসারণ : বাংলা ২য় পত্র - নবম ও দশম শ্রেণি, এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা (১ম পর্ব)

কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় কখনো কোনো একটি বাক্যে বা কবিতার এক বা একাধিক চরণে গভীর কোনো ভাব নিহিত থাকে। সেই ভাবকে বিস্তারিতভাবে লেখা, বিশ্লেষণ করাকে ভাব-সম্প্রসারণ বলে। যে ভাবটি কবিতার চরণে বা বাক্যে প্রচ্ছন্নভাবে থাকে, তাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। সাধারণত সমাজ বা মানবজীবনের মহৎ কোনো আদর্শ বা বৈশিষ্ট্য, নীতি-নৈতিকতা, প্রেরণামূলক কোনো বিষয় যে পাঠে বা বাক্যে বা চরণে থাকে, তার ভাব-সম্প্রসারণ করা হয়। ভাবসম্প্রসারিত ক্ষেত্রে রূপকের আড়ালে বা প্রতীকের ভেতর দিয়ে যে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, তাকে যুক্তি, উপমা, উদাহরণ ইত্যাদির সাহায্যে বিশ্লেষণ করতে হয়।

ভাব-সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে যেসব দিক বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন : 

  • উদ্ধৃত অংশটুকু মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে।
  • অন্তর্নিহিত ভাবটি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
  • অন্তর্নিহিত ভাবটি কোনো উপমা-রূপকের আড়ালে নিহিত আছে কি না, তা চিন্তা করতে হবে। 
  • সহজ-সরলভাবে মূল ভাবটিকে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
  • মূল বক্তব্যকে প্রকাশরূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনে যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। 
  • বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • বক্তব্য সাধারণত বিশ থেকে পঁচিশ লাইনের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। 

(toc)

পাপকে ঘৃণা কর পাপীকে নয়।

মূলভাব : প্রতিটি মানুষই নিষ্পাপ হয়ে পৃথিবীতে আসে। জন্মের সময় কোনো মানব শিশুর গায়ে পাপ-পঙ্কিলতার চিহ্ন থাকে না। অর্থাৎ, মানুষ জন্মসূত্রে পাপী হয় না; বরং পরিবেশ তাকে ক্রমে ক্রমে পাপীতে রূপান্তরিত করে।

সম্প্রসারিত ভাব : বিংশ শতাব্দীর এ সভ্যতার যুগে ক্রমেই বাড়ছে খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণের মতো অনৈতিক এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। কেউ লোভে পড়ে, কেউ জীবিকার তাগিদে আর কেউ বা সঙ্গদোষে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। সমাজের কুচক্রীমহল বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে অন্যায় কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত করছে প্রতিনিয়ত। এভাবেই ধীরে ধীরে একজন মানুষ হয়ে উঠছে দাগী আসামি কিংবা অপরাধী। কিন্তু তার জন্মের সময় সে আর দশজনের মতোই নিষ্পাপ ছিল। পৃথিবীর বুকে বেড়ে উঠতে গিয়ে নানা প্রতিক‚ল পরিবেশের সংস্পর্শেই মানুষ পাপাচারে প্রবৃত্ত হয়। স্বেচ্ছায় কেউ পাপী হয় না। বৈরী পরিবেশে, অসৎ সঙ্গ, জীবিকার তাগিদ কিংবা অন্য কোনো কারণেই মানুষ পাপপথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। মানুষের ইন্দ্রিয় সংযত না থাকলেই মানুষ পাপ-পুণ্যের ব্যবধান করতে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। মানুষ হিসেবে প্রত্যেককেই অন্যের প্রতি সহানুভ‚তিশীল থাকতে হবে। পাপ কর্মকে ঘৃণা করা প্রতিটি মানুষের পরম কর্তব্য ও পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু যে পাপী তাকে সমাজের এককোণে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া মহৎপ্রাণ মানুষের কাজ নয়। তারাও মানুষ এবং আমাদের বৃহত্তর সমাজেরই অংশ। তাই তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা অবিবেচকের কাজ। তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে তাদের স্বভাবের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তবেই সমাজে হবে চির কল্যাণ ও মঙ্গলের জয়যাত্রা।

মন্তব্য : সমাজে নানা ধরনের মানুষ বাস করে। সবাইকে নিয়েই গঠিত হয় সমাজ। এদের মধ্যে যারা পাপকর্মে প্রবৃত্ত হয় তাদের কর্মকে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। তবে মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে চেষ্টা করতে হবে পাপীকে সংশোধন করার। পাপকে ঘৃণা করলেও পাপীকে ঘৃণা করা উচিত নয়। 


অর্থই অনর্থের মূল। 

মূলভাব : পার্থিব জীবনে মানুষের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অর্থ। তাই অর্থ মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন, তথা অর্থকে সে পরিচালিত করে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যখন অর্থের কাছে জিম্মি হয়ে অর্থের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখনই জগৎসংসারে অর্থ অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সমপ্রসারিত ভাব : জীবনধারণের জন্য অর্থ অপরিহার্য। পার্থিব জীবনে অর্থ বা বিত্তই মানুষের একান্ত কামনা। মানুষ তার কাক্সিক্ষত অর্থ উপার্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে এবং নানা প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করে। অর্থ মানুষের আজীবন প্রয়োজন মেটায় বলে অর্থ ছাড়া জীবন অর্থহীন বা মূল্যহীন বলে বিবেচিত হয়। তাই সারা জীবন মানুষ অর্থের পেছনে ছোটে। বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র অর্থের মাপকাঠিতেই প্রতিপত্তি ও সম্মান নির্ধারিত হয়। কী করে তাই অধিক অর্থ উপার্জন করা যায় তার জন্য মানুষের চেষ্টার অন্ত নেই। বিপদে-আপদে, উৎসবে-আনন্দে, জন্ম-মৃত্যুতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু অর্থের অযাচিত ব্যবহার সুখ ও কল্যাণের বদলে অকল্যাণ বয়ে আনে। অর্থের লোভে নীতিবর্জিত হয়ে মানুষ অহরহ নানা দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়। অন্যায় পথে অর্জিত অর্থ মানুষকে বিবেকহীন ও দাম্ভিক করে তোলে। অর্থের লালসা মানুষের নৈতিক অধঃপতন ঘটায়। অর্থের লোভেই চরিত্রহীন হয়ে মানুষ সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। পৃথিবীর সকল দ্ব›দ্ব-সংঘাত ও অশান্তির মূলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে অর্থ। অর্থ-সম্পদের স্বার্থেই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধের উন্মাদনা জাগে, শ্রমিকে-মালিকে হয় মতবিরোধ, ভাইয়ে-ভাইয়ে শুরু হয় চরম শত্রæতা। অর্থের লোভেই মানুষ মানুষকে খুন করে। তাই বলা যায়, জগতের সব অশান্তি ও অনর্থের মূলে রয়েছে অর্থ।
মন্তব্য : সুষ্ঠু সমাজজীবন ও স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করার জন্য অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু অর্থ যেন অনর্থের মূল না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। তাই অর্থ-সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারই এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে।


অর্থসম্পত্তির বিনাশ আছে কিন্তু 
জ্ঞানসম্পদ কখনো বিনষ্ট হয় না।

মূলভাব : পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তুর ক্ষয় বা বিনাশ অনিবার্য। কিন্তু যে-সম্পদটির বিনাশ নেই বরং বিকাশ আছে তা হলো জ্ঞানসম্পদ। জ্ঞান অবিনাশী বলে একবার তা অর্জন করলে সারা জীবনের সম্পদ হিসেবে সঞ্চিত হয়। তাই জ্ঞানই মানুষের একান্ত নিজস্ব মহামূল্যবান সম্পদ।
সম্প্রসারিত ভাব : মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অর্থের বিকল্প নেই। অর্থের জন্য মানুষ উদয়-অস্ত কঠোর পরিশ্রম করে। অর্থ দ্বারাই আমরা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে মানুষের অবস্থানকে নির্ণয় করে থাকি। কিন্তু এ অর্থসম্পদ কেবল মানুষের বাইরের দিকটিকেই প্রকাশ করে। অর্থ-সম্পদ যতই শক্তির অধিকারী হোক না কেন, জ্ঞানসম্পদের কাছে তা তুচ্ছ। সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি বিত্তশালী লোকের চেয়ে অনেক বেশি ধনবান। বস্তুত অর্থ-সম্পদের কোনো স্থায়িত্ব নেই। আজকে রাজা, কালকে ফকির এ রকম দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। বিত্তবানের ধনভাণ্ডার একসময়ে নিঃশেষ হয়ে আসে। কিন্তু বিদ্বানের জ্ঞানভাণ্ডার ক্রমশ সমৃদ্ধ হতে থাকে। সময়ের ব্যবধানে সে অধিকতর জ্ঞানী হতে থাকে। যিনি জ্ঞানী তিনি আমৃত্যু জ্ঞানরূপ সম্পদে সম্পদশালী। তাঁর জ্ঞানের ক্ষয় নেই। এমনকি মৃত্যুর পরেও তাঁর এই জ্ঞানের প্রাচুর্য পৃথিবীতে বিরাজ করে এবং জ্ঞানপিপাসুদের জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণ করে। এভাবেই জ্ঞানীরা মানুষের মনে অমরত্বের আসন লাভ করেন। তাই অর্থ-সম্পদে নয়, জ্ঞানসম্পদে সমৃদ্ধ ব্যক্তিগণই দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ, আর এ জন্যে অর্থসম্পদের মাপকাঠিতে নয়, বরং জ্ঞানসম্পদের মাপকাঠিতেই মানুষের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। 
মন্তব্য : জ্ঞান অতুলনীয় সম্পদ। জীবনের মতোই এটি মহামূল্যবান। জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়েও মহত্তর। মানুষ তার স্বরূপকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করতে পারে শুধু জ্ঞান আহরণের মধ্য দিয়েই। জাগ্রত করতে পারে নিজের ক্ষমতাকে, সহায় হতে পারে বিশ্বমানবতার।

 

“স্বদেশের উপকারে নাই যার মন, কে বলে মানুষ তারে পশু সেই জন।”

অথবা,  স্বদেশের প্রতি যার ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা নেই সে পশুতুল্য।

মূলভাব : দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ। দেশের সেবায়, জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করা প্রতিটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য।
সম্প্রসারিত ভাব : প্রিয় স্বদেশ ঘিরেই মানুষের অন্তরে রচিত হয় নানা স্বপ্ন। দেশের গৌরবে মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত হয়। আবার দেশের পরাজয়ে মানুষের অন্তরে নেমে আসে বেদনার ছায়া। একজন সচেতন মানুষ তার জন্মভ‚মিকে ভালো না বেসে পারে না। যদি কেউ ভালো না বাসে সে মানুষ নামের অযোগ্য। তাকে পশু বলাই শ্রেয়। কেননা, পশুর কোনো দেশ নেই, মানুষের আছে। একজন মানুষ যতই ধনবান, রূপবান কিংবা জ্ঞানবান হোক, তার অন্তরে যদি স্বদেশপ্রেম না থাকে, জন্মভ‚মির কল্যাণের জন্য যদি তার মন না থাকে, তাহলে সে নরাধম, সে বর্বর, সে পশু। আমাদের জন্মভ‚মি আমাদেরকে দিয়েছে পরম আশ্রয়। এর সুশীতল ছায়ায় আমরা লালিত হচ্ছি। অজানাকে জানা, অদেখাকে দেখার স্বপ্ন আমরা পূরণ করছি দেশের মাধ্যমেই। আমাদের মাতৃভ‚মি সারা পৃথিবীর সাথে আমাদের আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে। এর কল্যাণের জন্য, এর গৌরব বৃদ্ধির জন্য আমাদের অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে। স্বদেশের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব প্রতিটি মানুষের। দেশের গৌরবকে সমুন্নত রাখা একজন নাগরিকের পবিত্রতম কর্তব্য। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ এবং লালন করা একজন নাগরিকের একান্ত কর্তব্য। পতাকার রং বাড়ায় আত্মসম্মান। সুমধুর জাতীয় সংগীত জোগায় সঞ্জীবনী সুধা, স্বদেশের মাটির মতো এমন পবিত্র আর কিছু নেই। এর নদী, জল, শস্য ভরা প্রান্তর, নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি মানুষকে টেনে নেয় গভীর থেকে গভীরে।
মন্তব্য : স্বদেশপ্রীতি যার নেই সে পশুর সমান। দেশের উপকারে যিনি নিবেদিতপ্রাণ, তিনিই প্রকৃতপক্ষে মানুষ। পক্ষান্তরে, দেশ প্রেমহীন আত্মকেন্দ্রিক যার হৃদয়, সে নিঃসন্দেহে পশুর সমান।
 

কত বড়ো আমি, কহে নকল হীরাটি
তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি। 

মূলভাব : বস্তুর বাহ্যিক আকৃতিতে অভিভ‚ত না হয়ে তার অভ্যন্তরীণ সত্য উপলব্ধিতেই আছে সার্থকতা। আয়তনের দিক থেকে বিশালত্ব, চাকচিক্যের দিক থেকে ঔজ্জ্বল্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক নয়। মিথ্যা, ভিত্তিহীন পরিচয়ের অহংকার নিয়ে বেশিদিন চলা যায় না। একদিন না একদিন আসল পরিচয় প্রকাশিত হবেই।
সম্প্রসারিত ভাব : হীরা মহামূল্যবান ধাতু। খাঁটি হীরা আকারে ছোট হয়। পক্ষান্তরে নকল হীরা হয় আকারে বড়। কিন্তু নকল হীরা যতই বড় হোক না কেন, সে আসল হীরার মতো অপরূপ আলোকরশ্মি বিচ্ছুরণের মাধ্যমে মনোহর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করতে পারে না। তার আকৃতি বা আত্মপ্রচার কোনোটাই তাকে খাঁটি হীরায় পরিণত করতে পারে না। সে মেকি, মেকিই থেকে যায়। বরং নিজের আকৃতি এবং আলোকরশ্মি বিচ্ছুরণে কৃত্রিমতার কারণে সে ধরা পড়ে যায়। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা সত্যিকার অর্থে নিকৃষ্ট, হীনচিত্ত কিন্তু মিথ্যা অহমিকায় অন্ধ হয়ে তারা বাইরে প্রচার করে যে তারা অনেক বড়। এমনকি প্রচারসর্বস্ব পন্থায় সমাজের কাছ থেকে নাম কেনার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, অনেক সময় হীনচিত্তের এ মানুষগুলো নকল হীরের মতো আমাদের সমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না। তাদের আত্মপ্রচারের মধ্য দিয়ে তারা যে প্রকৃত অর্থে অন্তঃসারশূন্য তা ধরা পড়ে যায়। একদিন তাদের সত্যিকার মুখোশ বেরিয়ে পড়ে। তখন মুখ লুকোবার জায়গা থাকে না। বস্তুত নিজের ঢাক নিজে পিটিয়ে কখনও বড় হওয়া যায় না। প্রকৃতই যারা বড় তাঁদের ক্ষমতা জাহিরের প্রয়োজন হয় না। তাঁদের সুকৃতির আলোতেই লোকে তাদের পরিচয় পায়। আকাশে চাঁদ উঠলে তাকে দেখার জন্য আলো জ্বালানোর প্রয়োজন হয়। তেমনিভাবে প্রকৃত মহৎ ব্যক্তিদের স্বভাব ও কর্মের গুণে স্বাভাবিকভাবেই তাদের চিহ্নিত করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, নিছক বাহ্য আকৃতি কারোর আসল পরিচয় বহন করে না। হৃদয়ের বিশালতাই মানুষকে বড় করে, দেহের বিশালতা কিংবা অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য বা ক্ষমতার প্রাবল্য তাকে একটুও বড় করে না।
মন্তব্য : বস্তুত যাদের কর্মের ভাণ্ডার শূন্য; নিষ্ঠা, সাধনা ও শ্রমে যারা বিমুখ, মনের দিক থেকে যারা নিকৃষ্ট, চিন্তায় যারা অনগ্রসর তারাই আত্মপ্রচারসর্বস্ব হয়। প্রকৃত গুণী ব্যক্তিগণ কখনোই অহেতুক আত্মপ্রচারের কৌশল অবলম্বন করেন না। যার গুণ আছে তার সুনাম এমনিতেই প্রকাশ পায়। 
 

দুর্নীতি জাতীয় জীবনে অভিশাপস্বরূপ।

মূলভাব : সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল কতকগুলো নিয়মনীতি মেনে চলে ও চলতে হয়। কিন্তু মানুষ যখন স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ ঘটিয়ে অন্যায়ভাবে প্রচলিত নিয়মনীতি ও আইনকানুন লঙ্ঘন করে দুর্নীতির আশ্রয় নেয় জাতীয় জীবনে তখন নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।
সম্প্রসারিত ভাব : দুর্নীতি জাতীয় ও অর্থনৈতিক জীবনে এক দুষ্ট রাহু। দুরারোগ্য ব্যাধির মতোই তা সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার লোককে গ্রাস করে। দুর্নীতির প্রভাবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে অধঃপতন নেমে আসে। দুর্নীতির ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সকল নিয়মনীতিতে দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা তেমনি সমাজজীবনেও অবক্ষয়ের চিত্র প্রকট হয়ে ওঠে। দুর্নীতির ফলে প্রশাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সমাজে দেখা দেয় খুন-রাহাজানি, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মারামারিসহ নানা অপকর্ম। একজন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি কখনোই সুস্থ স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারে না। সে দেশ ও দশের মঙ্গলের কথা না ভেবে স্বার্থচিন্তায় মগ্ন হয়। তখন তার কাছে মানবিক মূল্যবোধ গৌণ হয়ে ওঠে। বিবেক, সততা তার কাছে হয় লাঞ্ছিত, অপমানিত। সে বেছে নেয় অন্যায় ও অসত্যের পথ। এভাবে দেশ ও সমাজ ক্রমেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। তাই দুর্নীতিকে জাতীয় জীবনে অভিশাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মন্তব্য : দুর্নীতির কারণে একটি জাতির মহত্তম অর্জনও বিফলে যেতে পারে। দুর্নীতির গ্রাসে কেবল অতীত ও বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। এই সামাজিক অভিশাপকে সমূলে উৎপাটনের জন্য সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
 

মিথ্যা শুনিনি ভাই
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

মূলভাব : মানুষের হৃদয় সকল উপাসনালয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপাসনালয়। কেননা, পবিত্র হৃদয়েই স্রষ্টার অবস্থান। মানুষের অন্তরগুলো যদি কল্যাণকামিতা আর পবিত্র চিন্তায় ভরে যায় তাহলে কোথাও আর অশান্তি ও অকল্যাণ থাকে না। 
সম্প্রসারিত ভাব : মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। বুদ্ধি-বিবেচনা এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় মানুষের সমকক্ষ আর কোনো প্রাণী নেই। মানুষের রয়েছে বিচার ও বিশ্লেষণের শক্তি। ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্য বিচার করে চলা মানুষের ধর্ম। পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দ, ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য নির্ধারণে মানুষকে পরিচালিত করে মানুষের মন। মন দ্বারা পরিচালিত হয়ে মানুষ সৎ কাজ করে এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করে। স্রষ্টা অন্তর্যামী। তিনি মানুষের হৃদয়ের খবরাখবর রাখেন। তাই তাকে পেতে হলে হৃদয়কে শুদ্ধ করতে হবে। যারা নির্মল হৃদয়ের অধিকারী, তারাই আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারেন। মিথ্যা, কপটতা এবং হীনম্মন্যতায় যাদের হৃদয় পরিপূর্ণ, তাদের মসজিদে-মন্দিরে গিয়ে লাভ নেই। তারা যতই সেজদা অথবা পূজা-অর্চনা করুক না কেন, কোনো কাজ হবে না। কেউ কেউ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মসজিদে-মন্দিরে গিয়ে আরাধনা করে; কিন্তু তার হৃদয় যদি কলুষমুক্ত না হয় তাহলে রাতভর আরাধনা করেও কোনো লাভ হবে না। তাই মন্দির বা কাবা শরিফ নয়, অন্তরই হচ্ছে আসল। অর্থাৎ অন্তর শুদ্ধ না করে কাবা শরিফে গিয়ে লাভ নেই। পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী যাঁরা তাদেরকে কাবা শরিফ গিয়ে আরো পূর্ণতা লাভ করতে পারেন। তাঁরা সহজেই সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করেন।
মন্তব্য : হৃদয়ের চেয়ে উৎকৃষ্ট আর কোনো কাবা, মন্দির নেই। নির্মল হৃদয়ের অধিকারী যারা তারাই সৃষ্টিকর্তাকে কাছে পেয়ে থাকেন। তাদের হৃদয়ই সত্যিকার আলোয় উদ্ভাসিত। তারাই স্রষ্টার প্রকৃত কল্যাণ লাভে সমর্থ।

প্রাণ থাকলেই প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।

মূলভাব : মনই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। মনই মানুষকে পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে গৌরব দান করেছে।
সম্প্রসারিত ভাব : মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হলো মানুষের একটা সুন্দর, অনুভ‚তিপ্রবণ মন আছে, যা আর কোনো প্রাণীর নেই। পৃথিবীরতে যত প্রকার জীব আছে, তাদের প্রত্যেকেরই প্রাণ রয়েছে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে মানুষ আর দশটা প্রাণীর মতোই একটা প্রাণী। তবে মনোজগতের বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে একেবারেই আলাদা। মন আছে বলেই মানুষের মধ্যে প্রেম আছে, কল্পনা আছে, সৌন্দর্যবোধ আছে, ধর্ম আছে। পৃথিবীর সকল পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দ, ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য নির্ধারণে মানুষকে পরিচালিত করে তার মন। এ মন বা হৃদয় দ্বারা পরিচালিত হয়ে মানুষ সৎ কাজ করে এবং শিক্ষা, সাধনা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানবিক গুণাবলি আয়ত্ত করে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। তখন অন্যান্য প্রাণী থেকে সে আলাদা হয়ে যায় এবং দৈনন্দিন জীবনের দ্ব›দ্ব-সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, স্বার্থচিন্তা, কুমন্ত্রণা প্রভৃতির সংস্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। মনের শক্তির কারণেই মানুষ আজ সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছতে পেরেছে। মানুষ তার মন দিয়ে সাধনা করে জীবনের বিচিত্র বিকাশ ঘটায়, যা অন্য কোনো প্রাণী পারে না। আবার কোনো প্রাণীই নিজেকে জানে না, কিন্তু মানুষ নিজেকে জানে। আর এটা সম্ভব হয় তার মনের মাধ্যমেই। মনই তার রহস্যময় আয়না, মনই তাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। তাই সকল প্রাণীর ওপরে মানুষের স্থান। যে মানুষের আকৃতি নিয়ে পশুসুলভ আচরণ করে, যার মধ্যে মানবতাবোধ, সত্যনিষ্ঠা, ঔদার্য, সৎবিবেচনাবোধ, বিবেক-বুদ্ধি ইত্যাদি নেই তাকে সত্যিকারের মানুষ বলা চলে না। তাই মানুষ হতে হলে শুধু প্রাণ থাকলেই চলবে না, প্রাণ ও মনের যুগপৎ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। 
মন্তব্য : জীবজন্তুর সারা জীবন কেটে যায় কেবল আত্মরক্ষা, বংশরক্ষা ও খাদ্য সংগ্রহে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মানুষকেও একই কাজ করতে হয়। তা সত্তে¡ও মানুষ বিশিষ্ট, কারণ সে জ্ঞান, বুদ্ধি, বিদ্যা, হৃদয় ও সুকোমল বৃত্তির অধিকারী বলে। 
 

দণ্ডিতের সাথে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।

মূলভাব : অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান চিরাচরিত। সকল শাস্তিই যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু দণ্ডদাতা বিচারক যদি মানবিক দিক থেকে সবকিছু বিবেচনা করেন এবং সমব্যথী হন তবেই সে বিচার হয় সর্বশ্রেষ্ঠ বিচার।
সম্প্রসারিত ভাব : ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠাই বিচারকের একমাত্র ধর্ম। নিরপেক্ষভাবে অপরাধ নির্ণয় করে অপরাধীকে শাস্তিদান করাই বিচারকের কাজ। এই কাজ অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু অপরাধীকে দণ্ডদানের ব্যাপারে বিচারককে সংবেদনশীল হতে হবে, হতে হবে অনুভ‚তিপ্রবণ। তা না হয়ে তিনি যদি অপরাধীকে নির্মমভাবে দণ্ডদান করেন, দণ্ডিতের বেদনায় তাঁর হৃদয়ে যদি করুণার উদ্রেক না হয়, তবে তাঁর দণ্ডদান হয়ে ওঠে প্রবলের অত্যাচার এবং তিনি হয়ে পড়েন বিচারক পদের অযোগ্য। যে দণ্ডিত, যাকে তিনি দণ্ড দান করলেন, সে অবশ্যই কোনো হতভাগ্য পিতামাতার সন্তান। সন্তানের ব্যথা-বেদনায় তারাও ব্যথিত হবেন। তাছাড়া যেকোনো শাস্তিই কষ্টদায়ক। অপরাধীকে সেই কষ্ট ভোগ করতে হয়। বিচারক যদি তার এবং তার স্বজনদের ব্যথা-বেদনার কথা চিন্তা করে ব্যথিত না হন, তাহলে তাঁর শাস্তিদান হবে নিষ্ঠুরতার নামান্তর। কাজেই, দণ্ডিতের প্রতি বিচারককে সমব্যথী হতে হবে। সমব্যথী বিচারকের বিচারই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচার এবং তিনি যে শাস্তিদান করেন, তাই সর্বোচ্চ শাস্তি।
মন্তব্য : দণ্ডদাতার মন অপরাধীর জন্য যদি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, তবে তা অপরাধীর হৃদয় এবং বিবেককেও স্পর্শ করবে। সেই সঙ্গে অপরাধী নিজের কৃত অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং জাগ্রত হবে তার পরিশুদ্ধ বিবেক।


প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার তাহারই।

মূলভাব : মানবকল্যাণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা প্রয়োজনে হাসিমুখে প্রাণ উৎসর্গ করে, অমরত্ব একমাত্র তাদেরই প্রাপ্য। ভীরুতা নয়, আত্মপ্রত্যয়ই জীবনের যথার্থ ধর্ম।
সম্প্রসারিত ভাব : মৃত্যু অনিবার্য, এর ভয়াল হাত থেকে কারো নিষ্কৃতি নেই। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর লীলাখেলা দেখেও মানুষ জীবনের মায়া ত্যাগ করে না। জীবনের প্রয়োজনেই সে বেঁচে থাকে। আবার জীবনের প্রয়োজনেই মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করে নেয়। মরণজয়ী দুঃসাহসী মানুষেরাই মৃত্যুকে বুক পেতে নিয়ে গড়ে তুলেছে মানবসভ্যতার মহিমান্বিত ঐশ্বর্য। মৃত্যুকে বরণ করে মৃতুকে জয় করেছেন তাঁরা। মৃত্যুভয়ে শঙ্কিত হয়ে জীবনযাপনের মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই। ভয়ের মধ্যে থাকলে জীবনের সুখ ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সেজন্যে ভয়ার্ত জীবন সফল জীবন বলে বিবেচিত হতে পারে না। জীবনকে সত্যিকারভাবে সফল ও উপভোগ্য করতে হলে মৃত্যুভয় পরিহার করতে হবে। কর্মময় মানবজীবনের প্রতিটি কাজেই কম-বেশি ঝুঁকি আছে। যে কাজ যত দুরূহ, যত বিপজ্জনক সে কাজের মৃত্যুর ঝুঁকি তত বেশি। এমন ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত সাহসীরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্ম সম্পাদন করতে পিছপা হয় না। এ কারণেই পৌরুষদীপ্ত লোকেরাই ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে সফলতা বয়ে আনে। বস্তুত মৃত্যু জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। তবে মৃত্যুর শ্রেণিভেদ আছে। মৃত্যু কখনো কাপুরুষোচিত, কখনো স্বাভাবিক, কখনো বীরোচিত। বীরোচিত মৃত্যুই মানুষকে অমরত্ব দান করে। মহৎ উদ্দেশ্যে মরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে মানুষ ভীত হয় না, তার জীবনই যথার্থ সার্থকতার দাবিদার। বেঁচে থাকার অধিকারী হতে হলে মরণকে তুচ্ছ বলে বিবেচনা করতে হবে।
মন্তব্য : জীবনের প্রতি মায়া দেখালে মৃত্যুভয় এসে জীবনকে মর্যাদাহীন করে তোলে। জীবনের প্রয়োজনে মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !