লায়লাতুল ক্বদরের তাৎপর্য ও আমল - Significance and deeds of Lailatul Qadar

আল্লাহ্ তাবারকা ওয়া তা‘আলা সরওয়ার-ই কায়িনাত, ফখর-ই মাওজূদাত, হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র উম্মতকে ‘خير أمة’(শ্রেষ্ঠ উম্মত)’র উপাধী দান করে সর্বোত্তম উম্মত বানিয়েছেন। তিনি এ উম্মতকে বহু এমন বৈশিষ্ট্যাবলী ও বিশেষত্ব দিয়েছেন, যা ইতিপূর্বের উম্মতগণের ভাগ্যে নসীব হয় নি। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, লায়লাতুল্ ক্বদর-এর নি’মাত-ই ‘উযমা, যা সরকারের শুভাগমণের পর সকল পবিত্র রজনীর মধ্যে সুমহান ও সর্বোত্তম। হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

إِنَّ اللهَ وَهَبَ لِأُمَّتِيْ لَيْلَةَ الْقَدْرِ وَلَمْ يُعْطَهَا مَنْ كَانَ قَبْلَهُمْ

“নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা ‘লায়লাতুল ক্বদর’ আমার উম্মতকে দান করেছেন এবং তাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে দান করেন নি।”[ ] এ রাত আসমানের ফিরিশতাদের জন্য ঈদের রাত এবং দুনিয়াতে মানবজাতির জন্য পূর্ণতার মি’রাজ অর্জনের রাত। এটি ওই রাত, যাতে দয়ার সাগর উত্তাল থাকে এবং কোন কল্যাণ প্রত্যাশীকে বঞ্চিত করা হয় না। রাতভর রহমতরাশির বারিধারা বর্ষিত হয়, খায়রাত-বারাকাত অবতীর্ণ হয়, মৃত অন্তরগুলোকে জীবিত করা হয় আর রূহসমূহের অন্ধকার জগতকে তাজাল্লীরাশির নূর দ্বারা আলোকোজ্জ্বল করা হয়, মু’মিনদের প্রতি ফিরিশতাকুল সালাম নিবেদন করতে আসে, আর মহামহিম রাব্বুল আলামীনের পবিত্র কালাম, দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ও বরকতময় ঐশীগ্রন্থ ক্বোরআনুল কারীমও এ রাতে অবতীর্ণ হয়। লায়লাতুল ক্বদরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফযীলত হচ্ছে, এটা সম্পর্কে ক্বোরআনুল কারীমে একটি পরিপূর্ণ সূরা নাযিল হয়েছে। ইরশাদ-ই বারী তা‘আলা:


إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ- وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ- تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ – سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ-

“নিশ্চয় আমি সেটা (ক্বোরআন) ক্বদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি; এবং আপনি কি জানেন ক্বদর রাত্রি কি? ক্বদরের রাত হাজার মাস থেকে উত্তম। এতে ফিরিশতাগণ ও জিবরাঈল অবতীর্ণ হয়ে থাকে স্বীয় রবের আদেশে প্রত্যেক কাজের জন্য। ওটা শান্তি- ভোর উদয় হওয়া পর্যন্ত।”[ ] [তরজমা-ই কানযুল ঈমান] এ সূরা দ্বারা বুঝা গেল যে, ‘লায়লাতুল ক্বদর’ এমন বরকতময় ও মহত্ব-মর্যাদাপূর্ণ রাত

 যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।

 এ রাতে ক্বোরআনুল হাকীম ‘লাওহ-ই মাহফূয’ থেকে দুনিয়ার আসমানে নাযিল হয়েছে।

 এ রাতে ফিরিশতাকুল ও হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম যমীনে অবতরণ করেন।

 এ রাতে সকাল উদয় হওয়া পর্যন্ত কল্যাণ ও বরকত অবতীর্ণ হয় এবং এ রাত শান্তি আর শান্তি।

‘লায়লাতুল ক্বদর’ প্রাপ্তীর কারণ

 ইমাম মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন,

إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أُرِيَ أَعْمَارَ النَّاسِ قَبْلَهُ. أَوْ مَا شَاءَ اللهُ مِنْ ذلِكَ. فَكَأَنَّهُ تَقَاصَرَ أَعْمَارَ أُمَّتِهِ أَنْ لاَ يَبْلُغُوا مِنَ الْعَمَلِ، مِثْلَ الَّذِي بَلَغَ غَيْرُهُمْ فِي طُولِ الْعُمْرِ، فَأَعْطَاهُ اللهُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন পূর্ববর্তী উম্মতগণের বয়স (আয়ু)-এর ব্যাপারে মনযোগ দিলেন, অথবা যা আল্লাহ্ তা‘আলা ইচ্ছা করেছেন; তখন তাঁর নিকট আপন উম্মতের বয়স কম মনে হলো। তিনি ভাবলেন, যখন পূর্ববর্তী লোকদের দীর্ঘায়ুর তুলনায় তাদের বয়স কম, তাহলে তাদের নেকীসমূহ্ও পূর্ববর্তীদের পর্যন্ত পৌঁছবে না। (অর্থাৎ কম হবে।) এ সময়ে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে ‘লায়লাতুল ক্বদর’ দান করেছেন, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।”[ ] তাফসীরে আযীযীতে রয়েছে যে, ‘সাহাবা-ই কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম যখন হযরত শাম‘ঊন রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র ইবাদত ও জিহাদ-এর আলোচনা শুনলেন, তখন হযরত শাম‘ঊন রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র প্রতি ঈর্ষান্তিত হলেন। রহমত-ই দো‘আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র নিকট আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো খুবই অল্প আয়ু পেয়েছি। এর মধ্যে কিছু অংশ নিদ্রায় কেটে যায়, কিছু জীবিকা উপার্জনে, কিছু আহার রন্ধন ও গ্রহনে এবং অপরাপর দুনিয়াবী বিষয়াদিতেও কিছু সময় ব্যয় হয়ে যায়। সুতরাং আমরা তো হযরত শাম‘ঊন রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র ন্যায় ইবাদত করতেই পারবো না, তাহলে এভাবে তো বনী ইসরাইল আমাদের থেকে ইবাদতে অগ্রগামী হয়ে যাবে। নবী-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে একটু চিন্তিত হলেন, তখনই হযরত জিব্রাইল আমীন আলায়হিস সালাম ‘সূরাতুল ক্বদর’ নিয়ে হুযূরের খিদমতে হাযির হলেন। আর শান্ত্বনা দেয়া হলো যে, প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম চিন্তিত হবেন না; আপনার উম্মতকে আমি প্রতি বছরে এমন এক রাত দান করেছি, যদি তারা ওই রাতে ইবাদত করে, তাহলে হযরত শাম‘ঊন রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি হয়ে যাবে।’[ ]


‘লায়লাতুল ক্বদর’ নামকরণের কারণ

এ পবিত্র ও বরকতময় রাতের নাম ‘লায়লাতুল ক্বদর’ রাখার কিছু হিক্মত নিচে পেশ করা হলো:

 ক্বদরের একটি অর্থ হচ্ছে- মর্তবা, মর্যাদা।

এরই উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, এ রাতের মহত্ব, মর্যাদা ও উঁচু মর্তবা হওয়ার কারণে এর নাম ‘লায়লাতুল ক্বদর’ তথা মর্তবাসম্পন্ন রাত রাখা হয়েছে। এ রাতের ইবাদতের মর্তবাও উঁচু পর্যায়ের, যে ব্যক্তি এ রাতে ইবাদত করে, সে আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে ক্বদর, মর্যাদা, সম্মানিত স্থান অর্জন করে এবং এ রাতের ইবাদতের মর্তবা এমন যে, সেটা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয়ে যায়।

 অপর একটি হিকতম হচ্ছে,

এ রাতে মর্যাদা ও উঁচু মর্তবাসম্পন্ন কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। কিতাব ও ওহী নিয়ে আগমনকারী ফিরিশতা হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালামও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আর এ সুমহানগ্রন্থ ‘কোরআনুল হাকীম’ যে মাহবূব-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তিনিও সর্বাধিক সম্মান ও মর্যাদাবান। সূরাতুল ক্বদর-এ এ শব্দ ‘ক্বদর’ তিনবার আসার হয়ত এটাই হিকমত।

ক্বদরের অন্যতম অর্থ হচ্ছে, তাকদীর বা ভাগ্য নির্ধারণী। যেহেতু এ রাতে বান্দাদের তাক্বদীরের ওই অংশ যা এ রমযান থেকে পরবর্তী রমযান পর্যন্ত আগমন করবে, সে সম্পর্কে ফিরিশতাদের দায়িত্ব অর্পন করে দেয়া হয়, এ কারণেও এ রাতকে ‘লায়লাতুল ক্বদর’ বলা হয়।


ক্বোরআন নাযিল

আল্লাহ্ তা‘আলা লায়লাতুল ক্বদরের ফযিলতের বড় কারণ বর্ণনা করেন যে, এটি ক্বোরআন নাযিলের রাত। সূরা-ই দোখান-এ ইরশাদ-ই বারী তা‘আলা:

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ “নিশ্চয় আমি সেটাকে (ক্বোরআন) বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি।”[ ] এ বরকতময় রাত দ্বারা কিছু মুফাস্সিরীন-ই কিরাম ‘শব-ই বরাত’ উদ্দেশ্য নিয়েছেন।


হাজার মাসের চেয়ে উত্তম

লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলতের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এ রাতের ইবাদতের সাওয়াব হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। এ সুক্ষ্ম বিষয়টি লক্ষনীয় যে, শব-ই ক্বদরকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলা হয়েছে, কিন্তু এটা বলা হয় নি যে, কতগুণ বেশি উত্তম। দশ গুণ, শত গুণ বা হাজার গুণ বা তার চেয়েও বেশি। একটি অভিমত এও রয়েছে যে, ‘ أَلْفَ شَهْرٍ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হাজার-এর নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, বরং ‘লায়লাতুল ক্বদরকালের চেয়ে উত্তম। অর্থাৎ বেশির চেয়ে বেশি কাল যত হওয়ার তোমরা কল্পনা করতে পার, ‘লায়লাতুল ক্বদর তার চেয়েও উত্তম ও শ্রেষ্ঠ।


দ্বিতীয় সুক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে, এক হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়। অতঃপর যদি কোন ব্যক্তি ৮৩ বছর ৪ মাস পর্যন্ত দিন-রাত ধারাবাহিকভাবে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদত করে, তাহলেও এক লায়লাতুল ক্বদরের ইবাদত এত দীর্ঘ সময়ের ইবাদত থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। যদি এ দীর্ঘ সময়ে কোন ‘লায়লাতুল ক্বদর না হয়। অনুরূপ এভাবেও বলা যেতে পারে, যদি কোন ব্যক্তি লায়লাতুল ক্বদরের ইবাদত করে, তাহলে সে যেন ৮৩ বছর ৪ মাস আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদতে অতিবাহিত করলো, নয় বরং তার চেয়ে বেশি সাওয়াব হাসিল করবে। অতঃপর এতেই শেষ নয়! যদি প্রার্থনা সত্য হয়, তাহলে প্রতি বছর ‘লায়লাতুল ক্বদর’ নসীব হতে পারে। এটা যেন সামান্য মেহনত দ্বারা কয়েক হাজার মাসের চেয়ে অধিক সাওয়াব ও প্রতিদান হাসিল করা যায়।


ফিরিশতাকুলের অবতরণ

 হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

إِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ نَزَلَ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي كُبْكُبَةٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ يُصَلُّوْنَ عَلٰى كُلِّ عَبْدٍ قَائِمٍ أَوْ قَاعِدٍ يَذْكُرُ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ-الخ

“যখন ‘লায়লাতুল ক্বদর হয়, তখন জিব্রাঈল আলায়হিস সালাম ফিরিশ্তাদের জমা‘আতের মধ্যে অবতরণ করে। তারা ওই প্রত্যেক দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট বান্দার অনুকূলে দো‘আ করে, যে আল্লাহ্র যিক্রে রত থাকে।”[ ]  হুযূর সায়্যিদুনা শায়খ গাউসুল আ’যম আবদুল ক্বাদের জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু স্বীয় গ্রন্থ ‘গুনিয়াতুত্ ত্বালিবীন’-এ এরশাদ করেন,

فَإِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ يَأْمُرُ جِبْرِيْلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَيَهْبِطُ فِيْ كَبْكَبَةٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ وَمَعَهُ لِوَاءٌ أَخْضَرُ إِلَى الْأَرْضِ، فَيَرْكُزُهُ عَلٰى ظَهْرِ الْكَعْبَة، وَلَهُ سِتُّمِائَةِ جَنَاحٍ لَا يَنْشُرُهَا إِلَّا فِيْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ، فَيَنْشُرُهَا فِيْ تِلْكَ اللَّيْلَةِ، فَيُجَاوِزُ الْمَشْرِقَ وَالْمَغْرِبَ، وَيَبُثُّ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ الْمَلَائِكَةَ فِيْ هٰذِهِ الْأُمَّةِ فَيُسَلِّمُوْنَ عَلٰى كُلِّ قَائِمٍ وَمُصَلٍّ وَذَاكِرٍ، وَيُصَافِحُوْنَهُمْ وَيُؤَمِّنُوْنَ عَلٰى دُعَائِهِمْ حَتّٰى يَطْلُعَ الْفَجْرُ، ثُمَّ يُنَادِىْ جِبْرِيْلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: يَا مَعْشَرَ الْمَلَائِكَةِ الرَّحِيلَ الرَّحِيلَ، فَيَقُوْلُوْنَ: يَا جِبْرِيْلُ مَا صَنَعَ اللهُ فِيْ حَوَائِجِ الْمُؤْمِنِيْنَ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ فَيَقُوْلُ: إِنَّ اللهَ تَعَالٰى نَظَرَ إِلَيْهِمْ وَعَفَا عَنْهُمْ وَغَفَرَ لَهُمْ إِلَّا أَرْبَعَةً، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هٰؤُلَاءِ الْأَرْبَعَةُ: مُدْمِنُ خَمْرٍ، وَعَاقٌّ لِوَالِدَيْهِ، وَقَاطِعُ رَحِمٍ، وَمُشَاحِنٍ

‘যখন ‘লায়লাতুল ক্বদর’ হয়, তখন হযরত জিব্রাইল আলায়হিস সালাম আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে সবুজ পতাকা নিয়ে জাঁকজমক সহকারে ফিরিশতাকুলের একটি দল নিয়ে যমিনে অবতরণ করেন। পতাকাটি কা’বার ছাদে স্থাপন করেন। হযরত জিব্রাইল আলায়হিস সালামের ছয়শত পাখা রয়েছে, তিনি স্বীয় সকল পাখা শুধু লায়লাতুল ক্বদরে প্রসারিত করেন; যা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তকেও অতিক্রম করে যায়। হযরত জিব্রাইল আলায়হিস সালাম ফিরিশতাকুলকে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে ছড়িয়ে দেন। ফিরিশতাকুল মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ হয়ে ক্বিয়ামকারী নামাযী ও যিক্রকারীকে সালাম করে এবং তাদের সাথে ‘মুসাফাহা’ (করমর্দন) করে। মুসলমানগণের দো‘আতে তারা ‘আ-মীন’ বলতে থাকে। এ অবস্থা ফজর উদয় পর্যন্ত চলতে থাকে। অতঃপর হযরত জিব্রাইল আলায়হিস সালাম আহ্বান করেন, হে ফিরিশতাকুল! প্রত্যাবর্তন, প্রত্যাবর্তন। তখন তারা (ফিরিশতাকুল) বলেন, হে জিব্রাইল! উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রয়োজনসমূহ পূরণে আল্লাহ তা’আলা কী ফয়সালা করেছেন? তিনি (হযরত জিব্রাইল) বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি রহমতের নজর দিয়েছেন, তাদের ক্ষমা করেছেন, সকলকেই ক্ষমা করেছেন কিন্তু চার প্রকারের লোক ব্যতিরেকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ কেেরন: এ চারজন হলো: মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, পিতামার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং বিদ্বেষ পোষণকারী।’


‘লায়লাতুল ক্বদর’ নির্ধারণ সম্পর্কে ইমামগণের অভিমত

রমযানুল মুবারকের কোন দিন মূলত: ‘লায়লাতুল ক্বদর’ এ বিষয়ে ওলামা-ই দ্বীনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সহীহ বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘উমদাতুল ক্বারী’ তে রয়েছে,

 ইমাম-ই আ’যম আবূ হানীফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে এ বিষয়ে দু’টি মত পাওয়া যায়। যথা:

১. أَنَّهَا فِي رَمَضَان، تتقدم وتتأخر ‘এটি (লায়লাতুল ক্বদর) রমযান শরীফে রয়েছে, যা আগে-পরে হতে পারে।

২. الْمَشْهُور عَن أبي حنيفَة أَنَّهَا تَدور فِي السّنة كلهَا، وَقد تكون فِي رَمَضَان، وَقد تكون فِي غَيره، وَصَحَّ ذَلِك عَن ابْن مَسْعُود وَابْن عَبَّاس وَعِكْرِمَة وَغَيرهم

‘ইমাম আবূ হানীফা থেকে প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, সেটি পুরো বছরে ঘুরতে থাকে। কখনো সেটা রমযানুল মুবারকে হয় আর কখনো অপর কোন মাসে হয়। এ অভিমতটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হযরত ইকরামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমসহ অপর সাহাবীগণ থেকেও সঠিক মত হিসেবে বর্ণিত।

 ইমাম শাফেয়ী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র অভিমত হচ্ছে,

وَعند الشَّافِعِي فِي الْعشْر الْأَخير لَا تنْتَقل وَلَا تزَال إِلَى يَوْم الْقِيَامَة.

‘লায়লাতুল ক্বদর রমযানুল মুবারকের শেষ দশকে রয়েছে, আর সেটার রাত নির্দিষ্ট, এতে কিয়ামত পর্যন্ত কোন পরিবর্তন হবে না।’

 ইমাম আবূ ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিমা’র অভিমত হচ্ছে,

لَا تتقدم وَلَا تتأخر، لَكِن غير مُعينَة. وَقيل: هِيَ عِنْدهمَا فِي النّصْف الْأَخير من رَمَضَان

‘লায়লাতুল ক্বদর’ রমযানুল মুবারকেই রয়েছে, আগে-পরে নয়। তবে দিনটি নির্দিষ্ট নয়। তাঁদের অপর একটি মত হচ্ছে, সেটি রমযানুল মুবারকের শেষ পনের দিনে রয়েছে।’[ ]  ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হিমা’র মতে, এটি রমযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে হয়ে থাকে। কোন বছরের যে কোন রাতে এবং কোন বছরে অপর কোন রাতে হয়ে থাকে।


যদিও বা ওলামা-ই দ্বীনের মধ্যে লায়লাতুল ক্বদর নির্দিষ্টকরণে মতভেদ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তবে অধিকাংশের মত হলো প্রতিবছর মাহে রমযানুল মুবারকের ২৭ তম রজনীতে ‘লায়লাতুল ক্বদর’ হয়। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে,

 হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন,

وَاللهِ إِنِّي لَأَعْلَمُهَا وَأَكْثَرُ عِلْمِي هِيَ اللَّيْلَةُ الَّتِي أَمَرَنَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقِيَامِهَا هِيَ لَيْلَةُ سَبْعٍ وَّعِشْرِيْنَ

‘আল্লাহর শপথ! আমি রাতটি সম্পর্কে জানি এবং এ ব্যাপারে আমার সর্বাধিক অবগতি হচ্ছে, যে রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সালাত আদায় করতে আদেশ করেছেন সেটি সাতাশ তারিখের রাত (লায়লাতুল ক্বদর)।’(মুসলিম)


হযরত শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী আলায়হির রাহ্মাহ্ও বলেন, লায়লাতুল ক্বদর রমযান শরীফের ২৭ তম রজনীতে হয়ে থাকে। তিনি তাঁর মতের দৃঢ়তার জন্য দু’টি দলীল পেশ করেছেন। যথা: ১. لَيْلَةُ الْقَدْرِ -এর মধ্যে নয়টি বর্ণ রয়েছে, আর এ কলেমাটি ‘সূরা ক্বদর’-এ তিনবার এসেছে। এভাবে তিনকে নয় দ্বারা গুণ করলে গুণফল ২৭ আসে, যা এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করে যে, লায়লাতুল ক্বদর ২৭ তম রজনী। ২. এ সূরাতে ত্রিশ (৩০) টি কলেমা (শব্দ) রয়েছে। সাতাশতম কলেমা হচ্ছে, هِيَ যেটা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, لَيْلَةُ الْقَدْرِ ‘লায়লাতুল ক্বদর’। এ যেন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নেককার লোকদের প্রতি ইশারা যে, রমযান শরীফের ২৭ তম রজনীতে ‘লায়লাতুল ক্বদর’ হয়ে থাকে। (তাফসীরে আযীযী)


আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন,

لَيْلَةُ الْقَدْر میں مَطْلَعِ الْفَجْر حق ۔ مانگ کی اِستقامت پہ لاکھوں سلام


লায়লাতুল ক্বদরের গুরুত্ব

‘লায়লাতুল্ ক্বদর’ অতীব বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ রাত। এ রাতকে এ জন্যই লায়লাতুল ক্বদর বলা হয় যে, এতে পুরো বছরের হুকুম-আহকাম কার্যকর হয় এবং ফিরিশতাকুলকে পূর্ণ বছরের কার্যাদি ও খিদমতের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। এ রাতের ফযীলত অপরিসীম।

 হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন:

مَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

‘যে ব্যক্তি লায়লাতুল ক্বদরে ঈমান ও সাওয়াবের আশায় ক্বিয়াম করে (তথা নামায আদায় করে) তার ইতিপূর্বের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’ (বোখারী)

 হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

تَحَرَّوْا لَيْلَةَ القَدْرِ فِي الوِتْرِ مِنَ العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

“লায়লাতুল ক্বদর রমযানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রজনীগুলোতে তালাশ করো।”[ ]  হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

اِلْتَمِسُوْهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ: فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى-

“লায়লাতুল ক্বদর রমযানের শেষ দশ দিনে তালাশ করো-যখন নয় দিন অবশিষ্ট থাকে, সাত দিন অবশিষ্ট থাকে, পাঁচ দিন বাকী থাকে- সেগুলোতে।”[ ]


লায়লাতুল ক্বদরের আমল

এ রাতেও দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে বেশি পরিমাণে নফল নামায, সলাতুত্ তাস্বীহ নামায পড়া, ফযীলতপূর্ণ যিক্র ও আমলে রত থাকা উচিত। অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, অহমিকা, অহংকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রাখুন; কারো সম্পদ আত্মসাৎ করলে, সেটা ফিরিয়ে দিন; কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে, তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিন। বিশেষ করে পিতামাতার নিকট থেকে অবশ্যই নিজের ভুল-ত্রুটির ক্ষমা চেয়ে নিন। যে কোন দো‘আর প্রারম্ভে ও শেষে দুরূদ শরীফ পাঠ করতে ভুলবেন না। আল্লাহ্ তা‘আলা দুরূদ শরীফ অবশ্যই কবূল করেন; হাদীস শরীফে এসেছে, হুযূর সায়্যিদ-ই আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

اَلدُّعَاءُ مَحْجُوْبٌ عَنِ اللهِ حَتّٰى يُصَلّٰى عَلٰى مُحَمَّدٍ وَأَهْلِ بَيْتِهِ.

“দো‘আ আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে কবূল হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত হযরত মুহাম্মদ মোস্তফার প্রতি এবং তাঁর আহলে বায়ত-এর প্রতি দুরূদ পাঠ করা হয় না।”[ ]


 ক্বোরআনুল কারীম খতম

এ রাতে খতমে ক্বোরআন আদায় করা খুবই ফযীলতপূর্ণ। রমযানুল মুবারকে তারাভীহ নামাযের মধ্যে একবার ক্বোরআন মাজীদ খতম করা সুন্নাত-ই সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম এবং সকল মুসলমানের ধারাবাহিক আমল। এতে খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা মুস্তাহাব। সাহাবা-ই কিরামের এ তরীক্বা ছিল যে, যখন কেউ ক্বোরআন মাজীদ খতম করতেন, তখন দো‘আর জন্য অপর মুসলমান ভাইগণকেও দা‘ওয়াত দিয়ে ডেকে নিতেন।

ইমাম জালালুদ্দিন সায়ূতী রহমাতুল্লাহি আলায়হি লিখেছেন, খতমে ক্বোরআনে স্বীয় গৃহবাসী, পরিবার-পরিজন এবং বন্ধুদের কে অংশগ্রহন করানো উচিত। তাবরানী হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, ‘যেদিন তিনি খতমে ক্বোরআন করতেন, তখন স্বীয় গোত্রের লোকদেরকে একত্র করে খোদা তা‘আলার দরবারে দো‘আ করতেন।’[ ]


টিকা:

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, তাফসীর-ই র্দুরে মানসূর, খ–৮, পৃ. ৫৭০; কানযুল উম্মাল, খ– ৮, পৃ. ৫৩৬
আল্ ক্বোরআন, সূরা (৯৭) ক্বদর, আয়াত: ১-৫
ইমাম মালেক, আল্ মুয়াত্তা, খ–৩, পৃ. ৪৬২, হা/ ১১৪৫/৩৩৫
কোন কোন বর্ণনায়, ‘শামসূন’ (شمسون) পাওয়া যায়।
সংগৃহিত, তাফসীরে আযীযী, খ–৩, পৃ. ২৫৭
আল্ ক্বোরআন, সূরা (৪৪) দোখান, আয়াত: ৩
বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, খ– ৫, পৃ. ২৯০, হা/ ৩৪৪৪; মিশকাত শরীফ, খ– ১, পৃ. ৬৪৭, হা/ ২০৯৬
গুনিয়াতুত্ ত্বালিবীন, আরবী (মূল নাম: الغنية لطالبي طريق الحق عز وجل) খ–২, পৃ. ১২
‘উমদাতুল ক্বারী, খ–১১, পৃ. ১৩১
মুসলিম, আস্ সহীহ, كِتَابُ صَلَاةِ الْمُسَافِرِينَ وَقَصْرِهَا بَابُ التَّرْغِيبِ فِي قِيَامِ رَمَضَانَ খ– ০১, পৃ. ৫২৫, হাদিস নং-৭৬২;
তাফসীরে আযীযী, খ–৩, পৃ. ২৫৯ সংক্ষেপিত
বোখারী, আস্ সহীহ, كتاب فضل ليلة القدر بَابُ فَضْلِ لَيْلَةِ القَدْرِ খন্ড-০৩, পৃ. ৪৫, হাদিস নং-২০১৪;
বোখারী, আস্ সহীহ্, খ– ৩, পৃ. ৪৬, হা/ ২০১৭; মিশকাত শরীফ, খ– ১, পৃ. ৬৪৪, হা/ ২০৮৩
বোখারী, আস্ সহীহ্, খ– ৩, পৃ. ৪৭, হা/ ২০২১; মিশকাত শরীফ, খ– ১, পৃ. ৬৪৪, হা/ ২০৮৫
আত্ তানভীর শরহুল জা-মি‘ইস সগীর, খ– ৬, পৃ. ১৩২, হা/ ৪২৫০
আস্ সায়ূতী, আল্ ইতক্বান ফি ‘উলূমিল ক্বোরআন, পৃ.- ২৯৭
তিরিমিযী, আস্ সুনান, أَبْوَابُ الدَّعَوَاتِ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ খ– ৫, পৃ. ৪১৬ হাদিস নং- ৩৫১৩

লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ আবুল হাশেম,
পরিচালক-আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম। 

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !